Skip to content

Ekjon Himu Koyekti Jhi Jhi Poka – একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা Pdf Download

Himu Series
Ekjon Himu Koyekti Jhi Jhi Poka by humayun ahmed

একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা – হুমায়ূন আহমেদ

হিমু সিরিজের বইগুলোর মধ্যে একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা বইটি ৯ম। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ-এর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে হিমু অন্যতম। হিমু সিরিজের প্রথম বই হলো ময়ূরাক্ষী (১৯৯০)। প্রাথমিক সাফল্যের পর হিমু চরিত্র বিচ্ছিন্নভাবে হুমায়ুন আহমেদের বিভিন্ন উপন্যাসে প্রকাশিত হতে থাকে। একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা বইটি ১৯৯৯ সালের মে মাসে প্রথম প্রকাশিত হয়। পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে বইটি বের হয়। বইটি ডাউনলোড করতে অথবা অনলাইনে পড়তে নিচের লিংকে ক্লিক করুন।

হিমু কখনো জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে না। ছোটখাট ঝামেলায় সে পড়ে। সেই সব ঝামেলা তাকে স্পর্শও করে না। সে অনেকটা হাঁসের মত। ঝাড়া দিল গা থেকে ঝামেলা পানির মত ঝরে পড়ল।
আমার খুব দেখার শখ বড় রকমের ঝামেলায় পড়লে সে কী করে। কাজেই হিমুর জন্যে বড় ধরনের একটা সমস্যা আমি তৈরি করেছি। এবং খুব আগ্রহ নিয়ে তার কাণ্ড–কারখানা দেখছি।
হুমায়ূন আহমেদ
নুহাশপল্লী, গাজীপুর।

ভূমিকা

একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা উক্তি

বিবাহ এবং মৃত্যু-এই দুই বিশেষ দিনে লতা পাতা আত্মীয়দের দেখা যায়। সামাজিক মেলা মেশা হয়। আন্তরিক আলাপ হয়।

(একজন হিমু কয়েকটি ঝি ঝি পোকা। (পৃ:৮১)

Humayun Ahmed quotes

একজন হিমু কয়েকটি ঝি ঝি পোকা বইয়ের কিছু অংশ

আমার চেহারায় খুব সম্ভবত I am at your Service জাতীয় ব্যাপার আছে। আমি লক্ষ করেছি প্রায় সব বয়েসী মেয়েরা আমাকে দেখলেই টুকটাক কিছু কাজ করিয়ে নেয়। তার জন্যে সামান্য অস্বস্তিও বোধ করে না।
নিতান্ত অপরিচিত মহিলা নির্বিকার ভঙ্গিতে আমাকে বলবে–এই ছেলে, এই হলুদ পাঞ্জাবি, একটা রিকশা খুঁজে দাও তো। রিকশা না পেলে বেবিটেক্সি। মালীবাগ যাব। ভাড়া ঠিক করে এনো। কেয়ক
এই ধরনের কাজ আমি আগ্রহের সঙ্গে করি। দরদাম করে রিকশা ঠিক করি, জিনিসপত্র তুলে দেই। খট করে রিকশার হুড তুলি। এবং শেষপর্যায়ে প্রিয়জনদের উপদেশ দেবার মতো সামান্য উপদেশ দেই–শাড়ি টেনে বসুন। চাকার সঙ্গে পেঁচিয়ে যেতে পারে। হ্যাঁ এইবার হয়েছে।
শেষ উপদেশ রিকশাওয়ালাকে, রিকশা দেখেশুনে যাবে। No ঝাঁকুনি।
যার জন্যে এই কাজগুলি করা হয় তিনি খুব স্বাভাবিক থাকেন। আমার কর্মকাণ্ডে মোটেই বিস্মিত হন না। তিনি ধরেই নেন নিতান্ত অপরিচিত একজনের কাছ থেকে পাওয়া এই সেবা তার প্রাপ্য। রিকশা চলতে শুরু করলে আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রতার হাসি কেউ কেউ দেন। বেশিরভাগই দেন না। উদাস হয়ে থাকেন।
রহস্যটা অবশ্যই চেহারায়। কারোর চেহারাই থাকে মিথ্যুকের মত। তারা নির্ভেজাল সত্যি কথা বললেও সবাই হাসে এবং মনে মনে বলে–মায়ের কাছে খালাম্মার গল্প? মিথ্যার ব্যবসা আর কত করবে? এইবার খান্ত দাও না।
আবার কারোর চেহারা হয় সত্যুকের মত। যত বড় মিথ্যাই বলে মনে হয় সত্যি কথা বলছে।
কিছু চেহারা আছে চোর টাইপ। বেচারা হয়ত সাধু সন্ত মানুষ। স্কুলের অংক স্যার। শুধু চেহারার কারণে বাসে উঠলে বাসের অন্য যাত্রীরা চট করে পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ ঠিক আছে কি-না দেখে নেয়।
কসমেটিক সার্জারীতে চেহারা অদল–বদল করা হয় বলে শুনেছি। কসমেটিক সার্জনরা কি জানেন–মানুষের মুখের বিশেষ কোন জিনিসটির জন্যে সত্য ভাব, মিথ্যা ভাব, সাধু ভাব, চোর ভাব প্রকাশ পায়? জানা থাকলে খুব সুবিধা হত। চোর চেহারার মানুষ ছোট্ট একটা অপারেশন করিয়ে সাধু হয়ে যেত।
এ ধরনের উচ্চশ্রেণীর চিন্তা আমি করছি ইস্টার্ন প্লাজা নামক এক বিশাল শপিং মলের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে। শপিং মলে ঢুকব কি-না ভাবছি। চলন্ত সিঁড়ি আছে। বিনা পয়সায় রেলগাড়ি চড়ার মত সিঁড়িগাড়ি চড়া। আগে মানুষ হাঁটতো সিঁড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। এখন সিঁড়ি হাঁটে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।
Excuse me–
অল্পবয়েসী মেয়ের ঝনঝনে গলা।নিশ্চয়ই সে আমাকে কিছু করতে বলবে।
আমি ঘাড় ফেরালাম। ওকে আমাকে ক্ষমা করতে বলছে তাকে দেখা দরকার।
ক্ষমাপ্রার্থী এই তরুণীর বয়স বাইশ তেইশ। সাজগোজ একেবারেই নেই। সাজগোজ না-করে ক্যাজুয়েল থাকাটা বর্তমানের ফ্যাশান। অনেককে দেখছি চুল ছেলেদের মতো ছোট ছোট করে কাটছে। কানে বিচিত্র ধরনের দুল পড়ছে।
মাটির দুল : শান্তিনিকেতনী। শ্বাশত বাংলার মাটির গয়না উঠে এসেছে কানো। ও আমার দেশের মাটি
কাঠের দুল : জাপানী বাবাজীরা বাঁশ, কাঠ কিছুই ফেলছে না। রংচং মাখিয়ে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে।
প্লাস্টিকের দুল : ইউরোপীয়। প্রস্তর যুগ, লৌহ যুগ, তাম্র যুগের পর প্লাস্টিক যুগ।
লোহা লক্করের দুলা : অবশ্যই আমেরিকান। আমেরিকানরা অন্য সবার মত করবে না। আলাদা কিছু করবে। কাজেই তারা বানাচ্ছে এক কানের দুল। অন্য কান খালি।
কিছু কিছু দুল। এমনই বিচিত্র যে মেয়ের মুখের দিকে তাকানো হয় না। দুলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সময় চলে যায়। আমার এক মামাতো বোন (রেশমী, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। সেকেন্ড ইয়ার ফলিত রসায়ন।)। কানে যে দুল। পরে তা ফুলের টবের মতো। সেই টবে সবুজ পাতাওয়ালা গাছ আছে। একটা গাছে আবার পিচকি পিচকি নীল ফুল ফুটে আছে। আমি বললাম, রেশমী তোর এই টবে কি নিয়মিত পানি দিতে হয়? রেশমী বিরক্ত হয়ে বলল, পানি দিতে হবে কেন? এটা রিয়েল প্ল্যান্ট না, ইমিটেশন।
যে মেয়েটি মধুক্ষরা কণ্ঠে excuse me বলেছে তার কানে কোনো দুল নেই। সুন্দর একটা শাড়ি পরেছে। শাড়ি পরে বোধ হয়। অভ্যাস নেই। নানান জায়গায় সেফটিপিন দেখা যাচ্ছে। গোলগাল মুখ। চোখে চশমা। চশমার ফ্রেম রূপালি। আমার মনে হল—রুপালি না হয়ে সোনালি ফ্রেমের চশমা হলে খুব মানাত। এই মেয়ের মুখ তৈরিই হয়েছে সোনালি ফ্রেমের জন্যে।
আপনি কি আমার একটা উপকার করতে পারবেন?
আমি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললাম, অবশ্যই পারব। একটা না, দুটা উপকার করব। একটা নরম্যাল উপকার। আরেকটা ফাউ।
মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকে ফেলল। এই সময়ের মেয়েদের চরিত্রে দ্বৈত ভাব অত্যন্ত প্রবল। তারা পত্রিকায় ইন্টারভ্যু দেবার সময় বলবে–যে সব পুরুষের রসবোধ আছে, যারা কথায় কথায় রসিকতা করে তাদেরকেই তারা পছন্দ করে। সেইসব পুরুষ তাদের স্বপ্নের পুরুষ। বাস্তবে কোনো ছেলে রসিকতা করে কোনো মেয়েকে কিছু বললে সেই মেয়ে ভুরু কুঁচকাবেই। রসিকতা যত নির্মলই হোক, সেই মেয়ে রসিকতায় কলঙ্ক খুঁজে পাবে এবং মনে মনে বলবে–গোপাল ভাড় কোথাকার। সব সময় ফাজলামী।
মেয়েটি বলল, আমি অনেকক্ষণ হল রাস্তা ক্রস করার চেষ্টা করছি, পারছি না। অন্যদিন ট্রাফিক পুলিশ থাকে। আজ ট্রাফিক পুলিশও নেই। আপনি কি রাস্তা ক্রস করার ব্যাপারে আমাকে একটু সাহায্য করবেন?
আমি দেখি কী করা যায় বলেই ঝাঁপ দিয়ে দুহাত উঁচু করে রাস্তার মাঝখানে পড়ে গেলাম। সেইসঙ্গে বিকট চিৎকার— ট্রাফিক বন্ধ, ট্রাফিক বন্ধ। চাক্কা ঘুরবে না।
নিমিষের মধ্যে ব্রেক কষে সব গাড়ি থেমে গেল। রিকশাওয়ালারা দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির ড্রাইভাররা মুখ বের করে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে দেখতে চেষ্টা করল কী হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে টোকাইরা খুব মজা পায়। তারাও লাফ দিয়ে রাস্তায় নামল। এবং আমার মতোই হাত উঁচু করে গাড়ি আটকাতে লাগল। একজন অতি উৎসাহী ছুটে গিয়ে পর পর দুটা রিকশার পাম ছেড়ে দিল। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে চোখে ইশারা করলাম রাস্তা পার হতে। সে রাস্তা পার হল।
ইতিমধ্যে রাস্তায় জট পাকিয়ে গেছে। একটা গাড়ির ড্রাইভার ভয় পেয়ে গাড়ি উল্টোদিকে নেবার চেষ্টা করতে গিয়ে পুরোপুরি গিট্টু পাকিয়ে ফেলেছে। এই গিট্টু আপনা-আপনি খুলবে না। গিট্টু খুলতে এক্সপার্ট ট্রাফিক সার্জেন্ট লাগবে। সে এসে বেশ কিছু রিকশাওয়ালাকে মারধোর করবে–তারপর যদি কিছু হয়।
আমি তরুণীকে বললাম, আর কোনো সাহায্য লাগবে? আমি ধরেই নিয়েছিলাম মেয়েটি না–সূচক মাথা নাড়বে। সামান্য রাস্তা পার করাতে যে এত যন্ত্রণা করে তার ওপর ভরসা করা যায় না।
মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আরেকটু ফাউ সাহায্য করতে পারেন। আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারেন। একটা লোক আমাকে ফলো করছে। আমার ভালো লাগছে না।
কে ফলো করছে?
গলায় হলুদ মাফলারওয়ালা একটা লোক। আমি যখন ইস্টার্ন প্লাজায় ছিলাম তখনো আমার পেছনে পেছনে ঘুরেছে। এখনো দেখি পেছনে পেছনে আসছে।
প্যাঁচ লাগিয়ে দেব?
প্যাঁচ লাগাতে হবে না। দয়া করে আমার পেছনে পেছনে এলেই হবে।
আমি নিতান্ত অনুগতের মতো তার পেছনে পেছনে যাচ্ছি। মেয়েটি হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, ভালো কথা। আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না কেন?
আমি হকচকিয়ে গিয়ে বললাম, চিনতে পারার কথা?
অবশ্যই। আমি সীমার বান্ধবী।
সীমাটা কে?
সীমাটা কে মানে? সীমা আপনার মামাতো বোন। গত মাসে বিয়ে করেছে। কোর্টে গিয়ে গোপন বিয়ে। আপনি সেই বিয়েতে সাক্ষী ছিলেন।
ও হ্যাঁ। মনে পড়েছে। তুমিও ছিলে সেই বিয়েতে?
হ্যাঁ ছিলাম। এবং আপনি সেদিন আমার সঙ্গে অনেক গল্প করেছিলেন।
ও আচ্ছা।
সেদিন আমি সোনালি ফ্রেমের চশমা পরেছিলাম। আপনি বলেছিলেন, রুপালি ফ্রেমের চশমা হলে আমাকে খুব মানাত। আমার মুখটা না-কি তৈরিই হয়েছে রুপালি ফ্রেমের জন্যে। আমি আপনার কথামতো রুপালি ফ্রেম কিনেছি।
ও আচ্ছা।
আপনি আমাকে না চিনেই লাফালাফি করে গাড়ি থামালেন। আশ্চর্য তো। অন্য কোনো মেয়ে যদি আপনাকে রাস্তা পার করাতে বলতে আপনি কি এরকম লাফালাফি করতেন?
বুঝতে পারছি না।
আমার মনে হয় করতেন। আমার নাম কি আপনার মনে আছে?
অবশ্যই মনে আছে। তবে মনে থাকলেও মন থেকে টেনে মুখে আনতে একটু সমস্যা হচ্ছে। ফুলের নামে নাম। হয়েছে?
বলুন কী ফুল।
প্রচুর গন্ধ আছে এমন একটা ফুল। রাতে ফোটে। মনে পড়েছে। তোমার নাম জুঁই।
কিছুই হয়নি। আমার নাম আঁখি।
ও আচ্ছা, আঁখি।
মেয়েটি তার গাড়ি খুঁজে পেয়েছে। কালো রঙের বিশাল এক গাড়ি। গাড়ির মতো গাড়ির ড্রাইভারও বিশাল। ড্রাইভার সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে দেখে ভালো লাগল। মানুষের সন্দেহের দৃষ্টিতে এমন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে কেউ স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকালে ধাক্কার মতো লাগে। সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালে মনে হয় সব ঠিক আছে।
আঁখি বরফ শীতল গলায় বলল, গাড়িতে উঠুন।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, আমাকে গাড়িতে উঠতে বলছ!
হ্যাঁ।
কেন বলো তো?
আগে গাড়িতে উঠুন। তারপর বলছি।
আমি গাড়িতে উঠে পড়লাম। আঁখি বলল, সহজে আমার মন খারাপ হয় না। আপনি আমাকে চিনতে পারেননি এইজন্যে মন খারাপ লাগছে। যে মেয়ে আপনার সামান্য কথায় চশমার ফ্রেম বদলে ফেলে আপনি তাকে চিনবেন না, এটা কেমন কথা?
বিশালদেহী ড্রাইভার গাড়ির ব্যাক ভিউ মিরার নাড়াল। আমি এখন সেই আয়নায় ড্রাইভারের মুখ দেখতে পাচ্ছি। কাজেই সেও নিশ্চয়ই আমাকে দেখছে। ড্রাইভার কাজটা করেছে আমাকে চোখে-চোখে রাখার জন্যে। গাড়ি চলতে শুরু করল।
আঁখি বলল, দয়া করে পেছনে ফিরে দেখুন তো লাল রঙের কোনো গাড়ি আমাদের ফলো করছে কি-না।
আমি বললাম, না।
এখন না করলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখবেন ঐ গাড়ি আমাদের পেছনে চলে এসেছে। জানা কথা আসবে।
আমি পেছন দিকে তাকিয়ে আছি। আঁখি বলল, এই ভাবে পেছন দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হবে না। গাড়ি আসুক পেছনে–পেছনে। আপনি সোজা হয়ে বসুন।
আমি সোজা হয়ে বসলাম।
আমার সঙ্গে গাড়িতে যেতে আপনার কি অস্বস্তি লাগছে?
না।
তাহলে চুপ করে আছেন কেন, গল্প করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.